মোঃ রায়হান হোসেন: অবৈধ বালু উত্তোলন, নৌ-পথে বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং সীমান্তের চোরাচালান, সব মিলিয়ে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধেই উঠেছে মাফিয়াদের সরাসরি মদদ দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। আইনের রক্ষক হয়ে যিনি নদী ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করবেন, সেই তিনিই এখন অবৈধ সিন্ডিকেটের প্রধান পাহারাদার! সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার লালপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) সজল কুমার কানু যেন আইনের পোশাক গায়ে জড়ানো এক মাফিয়া ডন।
সম্প্রতি ফাঁড়ি সংশ্লিষ্ট ১৪ থেকে ১৫টি অডিও রেকর্ড এবং চাঁদাবাজির একটি গোপন তালিকা ফাঁস হওয়ার পর পুরো পুলিশ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতির এক নগ্ন চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
ফাঁস হওয়া একাধিক অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, নদীখেকো বালুদস্যুদের কাছে রীতিমতো বিক্রি হয়ে গেছেন আইসি সজল কানু। গত ২৮ জুলাই ফাঁড়ির একনিষ্ঠ পুলিশ সদস্য ইমরান সাহসিকতার সাথে অবৈধ ড্রেজার ও নৌকা আটক করলে, তাকে সাধুবাদ জানানোর বদলে উল্টো জেরার মুখে ফেলেন সজল কানু। অডিওতে স্পষ্টভাবে শোনা যায়, ড্রেজারটিকে প্রভাবশালী ‘শাহজাহান ভাই’ বা ‘এরশাদ’-এর সিন্ডিকেটের বলে উল্লেখ করে তা তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিজের আধিপত্য জাহির করতে তিনি জিডি (সাধারণ ডায়েরি)-তে “ইনচার্জ সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক ছেড়ে দেওয়া হলো” লিখতে বাধ্য করেন অধস্তন কর্মীকে।
আরেকটি অডিওতে অবৈধ ড্রেজার মালিক কুদ্দুস অকপটে স্বীকার করে, আইসি সজল কানুর সাথে তাদের গোপন মাসিক চুক্তি রয়েছে। প্রতি মাসে মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মাসোহারার বিনিময়ে নদী ধ্বংসের লাইসেন্স দিয়েছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। অন্য একটি ঘটনায় খোদ ফাঁড়ির পেছনেই ড্রেজার দিয়ে বালু লুটের খবর পেয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে জাহাঙ্গীর ও শামীম নামের প্রভাবশালীদের পক্ষে নির্লজ্জ সাফাই গাইতে শোনা যায় সজল কানুকে।
চোরাকারবারিদের নিজস্ব পাহারাদার সজল কানুর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। স্পিডবোট ঘাট এলাকায় চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের সাথে আইসি সজল কানুর গোপন ও নোংরা আঁতাত রীতিমতো বিস্ময়কর। গত ২৩ আগস্ট এক পুলিশ সদস্য অভিযানের অনুমতি চাইলে, আইসি সজল কানু তৎক্ষণাৎ ঘাটের সভাপতির ছেলে রুবেলকে ফোন করে অভিযানের অতি গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে দেন। শীর্ষ চোরাকারবারি জয়নালের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড পুলিশের অন্দরমহলের চরম পচনকে সামনে এনেছে।
জয়নাল দম্ভভরে স্বীকার করে, টাকার জোরে আইসি সজল কানুকে সে হাতের পুতুলে পরিণত করেছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে গত মাসে ৫০ হাজার টাকা, অবৈধ ‘লাইন ক্লিয়ারেন্সের’ জন্য ২০ হাজার টাকা এবং বিকাশে আরও ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার হিসাব অকপটে তুলে ধরে সে। আইসিকে পকেটে পুরে জয়নাল এতটাই বেপরোয়া যে, সে পুলিশকেই সরাসরি বদলি করে দেওয়ার হুমকি দেয়। সে দম্ভ করে বলে, “আপনার চুল পরিমাণ ক্ষতি হবে না, তাকে (আইসি) আমি ১০০০% বদলি করতেছি।”
অথচ এই সজল কানু কিছুদিন আগে নিজেই চোরাকারবারির মালামাল আটকে ‘বিশেষ অভিযানের’ ভুয়া বাহাদুরি প্রচার করেছিলেন গণমাধ্যমে, যা ছিল মূলত মাসোহারার টাকা নিয়ে বনিবনা না হওয়ার ফল।
আইসি সজলের দুর্নীতির সাম্রাজ্য কতটা সুবিস্তৃত, তা প্রমাণ করে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ২৬ জন এজেন্টের নাম ও মোবাইল নম্বর সম্বলিত একটি গোপন নথি। নদীপথের বৈধ-অবৈধ এমন কোনো খাত নেই, যেখানে তার কালো থাবা পড়েনি। তৌফিক, কুদ্দুস ও রফিকদের মাধ্যমে বালু সিন্ডিকেট, হান্নান, জয়নালদের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান, কাসেম মোল্লা ও কালাদের মাধ্যমে ট্রলার ঘাটের চাঁদাবাজি চলছে নির্বিঘ্নে।
এমনকি সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA)-এর নাম ভাঙিয়েও চলছে চাঁদাবাজি। দেশীয় মৎস্য সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ ‘চায়না দুয়ারী’ জালের অবৈধ কারবার থেকে রাসেলের মাধ্যমে নিয়মিত বখরা নেন তিনি। ফলে এক বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করলেও তার এলাকায় একটিও চায়না দুয়ারী জাল আটকের মামলা হয়নি।
সজল কুমার কানুর এই বেপরোয়া দুর্নীতির ইতিহাস নতুন নয়। ২০২০ সালের এপ্রিলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি থাকাকালীন অবৈধ পাথর উত্তোলন এবং ভারতীয় গরু পাচারকারীদের সহযোগিতার দায়ে তাকে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়েছিল। এমন কলঙ্কিত অতীত থাকার পরও কীভাবে তিনি নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিলেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নৌ-,পুলিশের সিলেটের এসপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে। অকাট্য সব তথ্য-প্রমাণ, ১৪-১৫টি কল রেকর্ড এবং ২৬ এজেন্টের তালিকা ফাঁসের পরও কেন ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন নৌ-পুলিশের সিলেটের এসপি? সচেতন মহলে এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তবে কি সজল কানুর অপরাধলব্ধে অর্জিত অর্থের ভাগবাটোয়ারা এসপিসহ ঊর্ধ্বতনদের পকেটেও যাচ্ছে? নতুবা দুর্নীতির এই মহারাজার খুঁটির জোর কোথায়?
রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়? সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি, অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশ সদর দপ্তরকে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দুর্নীতির বরপুত্র সজল কানু ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের সম্পদ ও পবিত্র পোশাক বিক্রি করে দেওয়া কোনো অসাধু কর্মকর্তার জায়গা প্রশাসনে হতে পারে না।
অভিযোগের বিষয়ে আইসি সজল কুমার কানুর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও, তিনি তা দেখেও কোনো ধরনের সাড়া না দিয়ে বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যান।
ধারাবাহিক সংবাদ নং-১৭